নেপোলিয়নের চিঠি নিয়ে দীর্ঘ ২১৭ বছর ধরে চলছিল রহস্য। চিঠিটির বড় একটি অংশ সাধারণ ভাষায় লেখা ছিল না। সেখানে ছিল দুই অঙ্কের সংখ্যা, এলোমেলো অক্ষর ও নানা প্রতীক। ফলে ঐতিহাসিক এই বার্তার প্রকৃত অর্থ এতদিন অধরাই ছিল। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই রহস্যের জট খুলেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
১৮০৯ সালের ১৬ মার্চ প্যারিস থেকে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। চিঠির প্রাপক ছিলেন তাঁর সৎপুত্র ও ইতালির ভাইসরয় ইউজিন। বার্তাটি জেনারেল অগাস্ট ডি মারমন্টের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশও ছিল। সে সময় মারমন্ট ডালমাছিয়ায় বিচ্ছিন্ন অবস্থানে ছিলেন।
কোডে ছিল সংখ্যা, অক্ষর আর প্রতীক
নেপোলিয়নের চিঠির শুরুটা ফরাসি ভাষায় লেখা হলেও এরপরের ২৪ লাইনে ছিল অস্বাভাবিক সব সংকেত। কোথাও দুই অঙ্কের সংখ্যা, কোথাও এলোমেলো অক্ষর, আবার কোথাও বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছিল। এ কারণে চিঠিটি শুধু পড়াই নয়, এর ভেতরে আসলে কী তথ্য লুকানো ছিল, সেটিও বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
দুই শতকের বেশি সময় ধরে ইতিহাসবিদ ও ক্রিপ্টোগ্রাফারদের কাছে এটি ছিল একটি আকর্ষণীয় ধাঁধা। কিন্তু আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবার সেই সংকেত বিশ্লেষণের নতুন পথ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
মাত্র ছয় ঘণ্টায় বের হলো গোপন তথ্য
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সেন্টিনেলওয়ানের প্রকৌশলী কার্টার চার্চের তথ্যমতে, ওপেনএআইয়ের তৈরি জিপিটি–৬ আস্ট্রা এআই মডেল ব্যবহার করে চিঠিটির তথ্য উদ্ধারের কাজ করা হয়। মাল্টি-মডেল ওয়ার্কফ্লোর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে মাত্র ছয় ঘণ্টা বলে দাবি করা হয়েছে।
উদ্ধার করা তথ্য অনুযায়ী, চিঠিটিতে ফ্রান্স ও মিত্রবাহিনীর সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল। নেপোলিয়ন মারমন্টকে তাঁর বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এটি শুধু ব্যক্তিগত বার্তা ছিল না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্যও এতে থাকতে পারে।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ছিল যুদ্ধের পরিকল্পনা
চিঠির কোড উন্মোচনের পর এতে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে চতুর্মুখী আক্রমণের কৌশলের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র এবং সে সময়ের সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল।
এ ধরনের তথ্য ঐতিহাসিক গবেষণার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একটি যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর অবস্থান, সম্ভাব্য আক্রমণের দিক এবং সামরিক নির্দেশনা জানা গেলে ওই সময়কার কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব।
ইতিহাসের রহস্য ভাঙবে এআই
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপোলিয়নের চিঠির মতো জটিল ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণে এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। আগে যে কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সংকেত বিশ্লেষণ, তুলনা ও গবেষণার প্রয়োজন হতো, আধুনিক এআই বিভিন্ন ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুত করতে পারে।
তবে ঐতিহাসিক নথির ক্ষেত্রে এআইয়ের পাওয়া ফলাফলকে সরাসরি চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার আগে মানব গবেষক ও ইতিহাসবিদদের যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুরোনো নথির ভাষা, সংকেত, প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে ফলাফল মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারপরও ২১৭ বছর ধরে রহস্যে থাকা নেপোলিয়নের চিঠি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসার দাবি ইতিহাস গবেষণায় এআইয়ের সম্ভাবনাকে আরও আলোচনায় এনেছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন