হাততালিকে আমরা সাধারণত আনন্দ, উল্লাস, সম্মতি বা উৎসাহ প্রকাশের একটি অতি সাধারণ মাধ্যম হিসেবেই চিনে থাকি। তবে জানলে অবাক হবেন যে, নিয়মিত হাততালি দেওয়াকে অনেকেই একটি অত্যন্ত সহজ এবং কার্যকরী শরীরচর্চা হিসেবেও বিবেচনা করে থাকেন।
হাতের তালুতে অসংখ্য স্নায়ু ও রক্তনালীর প্রান্ত যুক্ত থাকে। হাততালি দেওয়ার সময় এই স্নায়ু ও রক্তনালীর প্রান্তগুলোতে একধরনের উদ্দীপনা ও চাপ পড়ে, যার ফলে পুরো শরীরে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। সঠিক নিয়ম মেনে প্রতিদিন হাততালি দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে শরীরে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি থেকে শুরু করে মন ভালো রাখার মতো অন্তত ৫টি দারুণ স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, হাততালি দেওয়া শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে চমৎকারভাবে সহায়তা করে। একটি নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে হাততালি দিলে হাতের তালু ও আঙুলের বিভিন্ন অংশে চাপ ও ঘর্ষণ তৈরি হয়, যা সারা শরীরে রক্ত চলাচল দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। শরীরের প্রতিটি কোষে ও বিভিন্ন অংশে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পৌঁছে দিতে এই রক্ত সঞ্চালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি নিয়মিত হাততালির অভ্যাস হৃদ্যন্ত্রের সার্বিক সুস্থতার জন্যও বেশ সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের মনমেজাজ ভালো রাখতেও হাততালির জুড়ি মেলা ভার। হাততালি দেওয়ার সময় প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের শরীরে একধরনের আনন্দ ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সঙ্গে শরীরে ‘এন্ডরফিন’ নামের এক বিশেষ ধরনের হরমোন ক্ষরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ কমাতে এবং অশান্ত মনকে কিছুটা শান্ত করতে এই অতি সাধারণ অভ্যাসটি দারুণভাবে সহায়ক হতে পারে।
তৃতীয়ত, শরীরের নমনীয়তা বাড়াতেও হাততালি বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। হাতের তালু ও আঙুল নিয়মিতভাবে নড়াচড়া করার ফলে আমাদের অস্থিসন্ধির জড়তা বা আড়ষ্টতা অনেকটাই কমে যেতে পারে। এর পাশাপাশি হাতের পেশিগুলোকে সচল ও শিথিল রাখতেও এটি দারুণ সহায়তা করতে পারে। ফলে অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক চলন ঠিক রাখা এবং শরীরের সামগ্রিক নমনীয়তা বজায় রাখতে চমৎকার উপকার পাওয়া যেতে পারে।
চতুর্থত, অনেকেই হয়তো জানেন না যে হাততালি দেওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা সহায়ক হতে পারে। হাততালি দেওয়া মূলত এক ধরনের হালকা শারীরিক কর্মকাণ্ড বা ব্যায়াম। এই কাজটি করার সময় শরীরে অল্প পরিমাণে হলেও শক্তি ক্ষয় বা ক্যালরি বার্ন হয়। তাই নিয়মিত হাঁটাচলা বা অন্যান্য শরীরচর্চার পাশাপাশি হাততালির মতো সহজ নড়াচড়ার অভ্যাস আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণের যাত্রায় সামান্য হলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চম উপকারিতাটি হলো, এটি শরীরকে ঝরঝরে ও সতেজ রাখতে সাহায্য করতে পারে। হাততালির নিয়মিত অভ্যাস শরীরের বিভিন্ন অংশের নড়াচড়া বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তরল চলাচল বা লসিকাতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের সহায়তা পাওয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। মানবদেহের ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় পদার্থগুলো বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই লসিকাতন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে সঠিক নিয়মে হাততালি দেবেন? আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই হাততালির অভ্যাস করার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে হাতের তালুতে সামান্য নারকেল তেল বা আপনার পছন্দের অন্য কোনো তেল হালকা করে মালিশ করে নিতে পারেন।
এরপর মেরুদণ্ড একদম সোজা রেখে মাটিতে পদ্মাসন বা বজ্রাসনে বসে এই হাততালি দেওয়ার অভ্যাস শুরু করা যেতে পারে। তবে শুরুর দিকে একটানা অনেকক্ষণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রথমদিকে দুই থেকে তিন মিনিট হাততালি দেওয়ার পর ধীরে ধীরে এই সময় বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরের সপ্তাহে সময় বাড়িয়ে পাঁচ মিনিট এবং পর্যায়ক্রমে এটি ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত নিয়মিত চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, হাততালি দেওয়াকে কখনোই কোনো জটিল রোগের মূল চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প হিসেবে দেখা মোটেও উচিত নয়। শরীরে যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগ বা বড় ধরনের শারীরিক সমস্যা থেকে থাকে, তবে যেকোনো নতুন শরীরচর্চা শুরু করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন