পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীর বৈঠাকাটা ভাসমান হাটে ভোর হলেই শুরু হয় ব্যস্ততা। নদীর বুকে একের পর এক নৌকা এসে ভিড়তে থাকে। কোনো নৌকায় থাকে শাকসবজি, কোনো নৌকায় বিভিন্ন কৃষিপণ্য, আবার কোনো নৌকাই হয়ে ওঠে একটি ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম, পণ্য তোলা ও কেনাবেচা।

সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বসে এই ব্যতিক্রমী ভাসমান হাট। কয়েক ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদীর একটি অংশ যেন পরিণত হয় জমজমাট বাজারে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তরমুজের মৌসুমে এই বেচাকেনার পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বৈঠাকাটা বাজারে কয়েক ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য কেনাবেচার তথ্য উঠে এসেছে।

এই হাটে শুধু সবজি নয়, বিক্রি হয় সবজির চারা, নারকেল, তরমুজ, বিভিন্ন শস্য ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণ। স্থানীয় কৃষকেরা ভোরে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নৌকায় করে নিয়ে আসেন। অন্যদিকে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য কিনে ট্রলার কিংবা নৌপথে দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে নিয়ে যান।

নাজিরপুরের পাশাপাশি নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও এই হাটে আসেন। ফলে বৈঠাকাটা শুধু স্থানীয় কেনাবেচার জায়গা নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিপণ্য সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসাবাণিজ্যে নৌকার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই বৈঠাকাটা হাটের পুরো বেচাকেনা ব্যবস্থাটিও গড়ে উঠেছে নদী ও নৌকাকে ঘিরে। ভোরের দিকে শত শত নৌকা একসঙ্গে নদীতে অবস্থান করলে দূর থেকে পুরো জায়গাটিকে নদীর বুকে ভাসমান একটি গ্রামের মতো মনে হয়।

ভাসমান হাটটির আরেকটি আকর্ষণ হলো এখানে কৃষিপণ্যের পাশাপাশি নৌকাতেই বিভিন্ন খাবারের দোকান বসে। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে মিষ্টি পান, ভাতসহ নানা খাবার পাওয়া যায়। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পাশাপাশি হাট দেখতে আসা মানুষদের জন্যও তৈরি হয় আলাদা এক পরিবেশ।

স্থানীয়দের অনেকে বৈঠাকাটা বাজারকে ‘বাংলার ভেনিস’ বলে থাকেন। নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপন, নৌকায় পণ্য পরিবহন এবং পানির ওপর বাজার বসার দৃশ্যের সঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের জলপথকেন্দ্রিক জীবনের কিছুটা মিল থাকায় এমন উপমা ব্যবহার করা হয়।

কৃষিপণ্যের বেচাকেনার পাশাপাশি ভাসমান হাটটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এই ব্যতিক্রমী বাজার দেখতে আসেন। বিদেশি পর্যটকদেরও এখানে আসার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নদীর ওপর সারি সারি নৌকা, কৃষকদের পণ্য সাজিয়ে বসা এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল বেচাকেনার দৃশ্য দর্শনার্থীদের আগ্রহ তৈরি করে।

তবে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থা ও আবাসন সুবিধা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, রাস্তাঘাট ও থাকার ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে আরও বেশি মানুষ এই এলাকায় ভ্রমণে আসতে পারেন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।

ভাসমান হাটের সঙ্গে এখানকার কৃষকদের জীবনও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। কেউ মিষ্টি কুমড়া নিয়ে আসছেন, কেউ শাকসবজি, কেউ আবার ভাসমান কৃষিতে ব্যবহারের জন্য শ্যাওলা বা অন্যান্য উপকরণ বিক্রি করছেন। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত একটি বড় অংশই নদীপথকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এই হাটের অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা জানিয়েছেন। এখানে নারকেল, তরমুজ, শাকসবজি, সবজির চারা এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের বেচাকেনা হয়। খুব সকালে পাইকাররা পণ্য কিনে নৌপথে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।

বৈঠাকাটা ভাসমান হাট তাই শুধু একটি বাজার নয়, দক্ষিণাঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক কৃষি ও বাণিজ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কয়েক ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদীতে গড়ে ওঠা এই বাজারে কৃষক, পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নৌযানসংশ্লিষ্ট বহু মানুষের জীবিকা যুক্ত। নদী, নৌকা ও কৃষিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী হাট স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের একটি স্বতন্ত্র চিত্রও তুলে ধরে।