উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় সুপেয় পানি পাওয়া কঠিন। বিকল্প হিসেবে কেউ নলকূপের পানি ব্যবহার করেন, আবার কেউ বৃষ্টির পানি ধরে রেখে কয়েক মাসের প্রয়োজন মেটান। কিন্তু পানি দেখতে পরিষ্কার হলেই তা নিরাপদ এমন নিশ্চয়তা নেই। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় উপকূলের পানিতে আর্সেনিক, সিসা ও ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। ঘরে পান করার সময় পানির নমুনায় এই জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে। ই কোলাইয়ের উপস্থিতি মলজাতীয় দূষণের ইঙ্গিত দিতে পারে এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

জরিপে আরও দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের পানির উৎসে আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছে। লবণাক্ততা ও আর্সেনিকের পাশাপাশি পানি সংগ্রহ, পরিবহন এবং সংরক্ষণের সময় দূষণও বড় উদ্বেগের বিষয়।

উপকূলের অনেক পরিবার বৃষ্টির পানি ট্যাংক, ড্রাম বা কলসে জমিয়ে রাখে। এতে দূর থেকে পানি আনার কষ্ট কমে। কিন্তু ছাদ, পাইপ, সংরক্ষণপাত্র কিংবা অপরিচ্ছন্ন ট্যাংকের মাধ্যমে পানিতে দূষণ ছড়াতে পারে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার দাকোপের মতো এলাকায় বৃষ্টির পানি অনেক পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। তবে গবেষণায় সংরক্ষিত বৃষ্টির পানিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া এবং সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে শুধু বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করলেই নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। সংগ্রহের পদ্ধতি, ট্যাংকের পরিচ্ছন্নতা এবং পানির মান পরীক্ষা করাও জরুরি।

খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার কয়েকটি উপজেলায় নিরাপদ পানির সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। কিছু এলাকায় বছরের কয়েক মাস নির্ভরযোগ্য পানির উৎস পাওয়া যায় না। অনেক পরিবারকে দূর থেকে পানি আনতে হয়, যার বড় দায়িত্ব পড়ে নারী ও কিশোরীদের ওপর।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচটি উপজেলায় বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস নির্ভরযোগ্য পানি পাওয়া যায় না। পাইকগাছায় এ সময় ৭ দশমিক ১৫ মাস। নিরাপদ পানির অভাবে কোনো কোনো পরিবার বাধ্য হয়ে লবণাক্ত বা অপর্যাপ্তভাবে সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে।

দূষিত পানি পান করলে ডায়রিয়া, বমি এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে ত্বকের সমস্যা ও গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যজটিলতা দেখা দিতে পারে। সিসাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুদের বিকাশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব উদ্বেগজনক।

উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে কোনো একটি গবেষণায় দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেলেই লবণাক্ত পানিই সরাসরি হৃদ্‌রোগের কারণ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আগে ছাদ ও নালা পরিষ্কার রাখা, প্রথম দফার বৃষ্টির পানি ট্যাংকে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং ঢাকনাযুক্ত পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পানির নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। জীবাণু দূর করতে উপযুক্ত পদ্ধতিতে পানি ফুটিয়ে নেওয়া যেতে পারে, তবে ফুটিয়ে নিলে আর্সেনিক, সিসা বা লবণাক্ততা দূর হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলের মানুষের জন্য নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি পানির উৎস পরীক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। নিরাপদ পানি শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজন নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।