আসিয়ান কাপে তিন ম্যাচ খেলে তিনটিতেই হেরে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে কোনো পয়েন্ট না পেলেও পুরোপুরি শূন্য হাতে ফিরছে না লাল-সবুজের দল। ফারহান আলী ওয়াহিদের গোল, শুকি ইতোফুসার পারফরম্যান্স এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দুর্বলতা নতুন করে চিহ্নিত হওয়াই এই আসরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি।
আসরের প্রিমিয়ার ডিভিশনের ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও প্রতিপক্ষদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮১তম, যেখানে মালয়েশিয়া ৪৬, ইন্দোনেশিয়া ৬৪ ও সিঙ্গাপুর ছিল ৩২তম স্থানে।
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলে হারের পর সিঙ্গাপুরের কাছেও হারতে হয় বাংলাদেশকে। শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯-২ গোলের বড় ব্যবধানে হেরে শেষ হয় থমাস ডুলির দলের অভিযান। তিন ম্যাচে ১৩ গোল হজম করে মাত্র দুইবার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠাতে পেরেছে বাংলাদেশ।
তবে এই ব্যর্থতার মধ্যেও সবচেয়ে আলোচিত প্রাপ্তির নাম ফারহান আলী ওয়াহিদ। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে প্রথমার্ধের পরই মাঠ ছাড়েন এই তরুণ। এরপর সিঙ্গাপুর ম্যাচে বেঞ্চে থাকার পর ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে কঠিন সময়ে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই গোল করেন তিনি।
ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ যখন ৬-১ গোলে পিছিয়ে, তখন মাঠে নামেন ফারহান। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে রাকিব হোসেনের দারুণ ক্রস থেকে গোল করেন ১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার। জাতীয় দলের হয়ে মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচেই গোল করে ভবিষ্যতের জন্য নিজের সামর্থ্যের একটি ঝলক দেখিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশের আরেকটি প্রাপ্তি জাপানি বংশোদ্ভূত ফুটবলার শুকি ইতোফুসা। তিন ম্যাচেই মাঠে নেমেছেন ২২ বছর বয়সী এই উইঙ্গার। তাঁর গতি, টেকনিক ও আক্রমণাত্মক পাসিং বাংলাদেশের আক্রমণভাগে নতুন মাত্রা যোগ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে এর একটি ভালো উদাহরণও দেখা গেছে। ৩-০ গোলে পিছিয়ে থাকার সময় দ্রুতগতিতে বাঁ প্রান্ত দিয়ে উঠে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়েন শুকি। এরপর নিখুঁত ক্রসে ইমন শাহরিয়ারকে বল দেন, আর ইমন হেডে গোল করে ব্যবধান কমান।
অন্যদিকে টুর্নামেন্টে দলের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কোচ থমাস ডুলির দল পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইংল্যান্ডপ্রবাসী ফারহানকে ঘিরে কোচের সঙ্গে দূরত্ব এবং তাঁর বাবার সঙ্গে কথাকাটাকাটির খবর সামনে আসে। ডুলি অবশ্য এসব খবরকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
তবে ফারহানের পারফরম্যান্স নিয়ে কোচের প্রকাশ্য মন্তব্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে তাঁকে প্রথমার্ধের পর তুলে নেওয়ার কারণ হিসেবে পারফরম্যান্সকে উল্লেখ করেছিলেন ডুলি। একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে এমন মন্তব্য টুর্নামেন্ট চলাকালে দলের পরিবেশ ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯-২ গোলের পরাজয়ে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বড় ব্যবধানে হারের তালিকায় এই ম্যাচটি নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে। এর আগে ১৯৭৫ সালে হংকংয়ের কাছে ৯-১ এবং ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৯-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ।
রক্ষণভাগের দুর্বলতাও পুরো টুর্নামেন্টে স্পষ্ট হয়েছে। ইনজুরির কারণে অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণকে না পাওয়ায় তাঁর নেতৃত্ব ও সেট পিসে দক্ষতার অভাব অনুভব করেছে দল। তিন ম্যাচে ১৩ গোল হজমের পর বাংলাদেশের রক্ষণ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে আসিয়ান কাপ বাংলাদেশের জন্য হতাশার একটি অধ্যায় হলেও কিছু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও দেখিয়েছে। ফারহান ও শুকির মতো তরুণদের পারফরম্যান্স, রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং দল পরিচালনার নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে এই আসরে। এখন এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন