সরকারকে চাপে ফেলে সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোর জন্য বাজারে নতুন করে পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। এবার বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। লিটারে আরও ৬ টাকা দাম বাড়ানোই এই চক্রটির মূল টার্গেট বলে জানা গেছে।
নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে মিলগেট থেকে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কৌশলে অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডিলার পর্যায়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
বর্তমানে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে ক্রেতারা নিজেদের চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। ফলে বাজারে একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। এদিকে সরকারের নির্ধারিত দাম কার্যকর থাকার পরও কারসাজির সুযোগে খোলা সয়াবিন তেল খুচরা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি।
অর্থাৎ সরকার নতুন করে মূল্য নির্ধারণ না করলেও অসাধু চক্র বাজারে বাড়তি দামের বোঝা সরাসরি চাপিয়ে দিয়েছে ভোক্তার ঘাড়ে। এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন জানিয়েছেন, দেশের ৪ থেকে ৫টি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
বাকি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অন্য ছোট কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। ওইসব বড় কোম্পানি দেশের চাহিদামতো তেল আমদানির পর তা রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফা করতে তারা বছরের একেক সময় তাদের ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারকে চাপে ফেলে সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে এরা মূলত মূল্য বাড়িয়ে নেয়। গত কয়েক বছর একই পন্থায় ওই চক্র সরকারকে চাপে ফেলে মূল্য বাড়িয়ে নিয়েছে। এরপরও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজারে ৫-১০ টাকা বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি করা হয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর নয়াবাজারের ৬টি মুদি দোকানের ৪টিতেই এক ও দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের কোনো সরবরাহ দেখা যায়নি। পাশাপাশি জিনজিরা কাঁচাবাজারের ৮টি মুদি দোকান ঘুরে মাত্র ৩টিতে এক লিটারের বোতল সয়াবিন পাওয়া গেছে এবং বাকি ২টিতে মিলেছে দুই লিটারের তেল। তবে ওই সব দোকানে ৫ লিটারের তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।
জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাগর জানান, তাদের এক ও দুই লিটারের সয়াবিনের দৈনিক চাহিদা ২০ কার্টন হলেও ডিলাররা মাত্র ২ থেকে ৪ কার্টন দিচ্ছেন। কৌশলে তারা আগের মতো করে দাম বাড়াতে সরবরাহ কমাচ্ছে বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী।
এর আগে বিশ্ববাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের কারণ দেখিয়ে গত ১১ জুলাই ভোজ্যতেল লিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। তখন প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম খুচরা বাজারে ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা।
এছাড়া ৫ লিটারের বোতল এক হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৮৮ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। খোলা পাম তেলের দামও লিটারে ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তখন সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিলেও একদফা বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বৈঠকটি মীমাংসা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর গত ২ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীদের দাবি কিছুটা মেনে বোতলজাত এক লিটারের সয়াবিন তেলে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেলে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে দাবি মোতাবেক লিটারে ১০ টাকা না বাড়ায় ব্যবসায়ীরা পুনরায় কারসাজি শুরু করেছেন এবং সরবরাহ কমিয়ে সরকারকে চাপে ফেলছেন।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র বলছে, বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে সব খরচ এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহণ খরচও বেড়েছে। এসব কারণে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে, যাতে তাদের লোকসান হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল আরও বেশি দাম বাড়ানোর, কিন্তু বর্তমানে ভোজ্যতেলের কোনো সংকট না থাকায় পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার ৫ টাকা সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তিনি আরও জানান, নতুন করে দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে কোম্পানিগুলো কোনো চিঠি দেয়নি। তারা যদি মূল্যবৃদ্ধি করতে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, তবে সে বিষয়ে খতিয়ে দেখে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন