রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি যেকোনো সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্রের দাবি, বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রুত পদত্যাগ না করলে দলীয়ভাবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও তাঁকে জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পদত্যাগের পর দলীয়ভাবেও ফেরদৌসী আহমেদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বিএনপি ও সরকারের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গত দুই দিন ধরে এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় কী এবং ঘটনার পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে বুধবার জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে যার নামই উঠে আসুক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, লুটপাট ও জমি দখলের অভিযোগের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে সরকার ও দল বিব্রত। বিশেষ করে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশার নাম রয়েছে। তাঁরা ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর কার্যক্রমের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সমিতিটির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগাযোগ ছিল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা তৎপরতা চলছিল।

ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। ওই সময় সমিতির নামে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। সেই আবেদনে সভাপতি হিসেবে ফেরদৌসী আহমেদের স্বাক্ষর ছিল বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য সামনে এসেছে, সেগুলো যাচাই করে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।