নদী রক্ষা এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, দেশের অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। নদী রক্ষায় সরকার, জনগণ, গবেষক ও পরিবেশবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
বিশ্ব নদী দিবস ও মার্ক অ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে নদীর দখল ও দূষণ বন্ধের পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, নদীকে কেবল পানি প্রবাহের পথ হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি নদীর সঙ্গে পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য এবং নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
নদী রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নদীতীরে বর্জ্য ফেলা, অবৈধ দখল, দূষণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি—এসব সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এর আগে ঢাকার চারপাশের নদী নিয়ে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রীও জানিয়েছিলেন, নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে মার্ক অ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ দেওয়া হয় নদী ও জলসম্পদ সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেখক, গবেষণা, সাংবাদিকতা ও সংগঠনসহ বিভিন্ন বিভাগে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এতে নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা গবেষক, সাংবাদিক ও সংগঠকদের অবদানও সামনে আসে।
পানিসম্পদমন্ত্রী আরও বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদীকে নিরাপদ ও জীবন্ত রাখতে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে নদী ও মানুষের মধ্যে টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নদী রক্ষার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী ও জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ, নিষ্কাশন এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। ফলে এসব জলসম্পদ নষ্ট হলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এ কারণে উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, নদী ও জলসম্পদ সংরক্ষণে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তাদের স্বীকৃতি অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আলোচনা সভায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। নদী রক্ষার মতো বড় একটি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গবেষক, পরিবেশকর্মী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন—আলোচনায় সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের নদীগুলো শুধু প্রকৃতির অংশ নয়; দেশের কৃষি, নৌপরিবহন, মৎস্য, শিল্প, জনজীবন ও অর্থনীতির সঙ্গেও নদীর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই নদীর দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং সংযুক্ত খাল-জলাশয় সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ঢাকার নদীগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক আরেকটি অনুষ্ঠানে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছে।
বিশ্ব নদী দিবসের এই আয়োজন থেকে নদী রক্ষার বিষয়ে নতুন করে জনসচেতনতা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। নদীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, দূষণ কমানো, অবৈধ দখল প্রতিরোধ এবং গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নদীগুলোকে আরও টেকসইভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব—এমন লক্ষ্য নিয়েই সংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন