একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কমবেশি দেখা যেত মদনটাক পাখি। ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও এই বড় আকৃতির পাখিটি বাংলাদেশের প্রকৃতিতে খুব একটা অচেনা ছিল না। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন দেশের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় কদাচিৎ দেখা মেলে মদনটাকের।
সুন্দরবন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের কিছু এলাকায় এখনো এই পাখির উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকাতেও মাঝেমধ্যে মদনটাক দেখা যায়। তবে নিয়মিতভাবে এর দেখা পাওয়া এখন কঠিন। বিভিন্ন এলাকায় পাখিটির সংখ্যা কমে আসার বিষয়টি প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখি পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পাখিটির সঙ্গে সরাসরি পরিচয়ের একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে পাখিপ্রেমী তুহিন ওয়াদুদের। ২০২১ সালের শীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চড়ইল বিলের কাছে প্রথম মদনটাকের ছবি তোলেন তিনি। ভারতের সীমান্তঘেঁষা এই বিল এলাকায় প্রায় সারা বছরই মদনটাক থাকার কথা স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের কাছ থেকে জানা যায়।
চড়ইল বিলে গিয়ে প্রথমে পাখিটির দেখা না পেলেও পরে নুরু মাঝির সহযোগিতায় বিলসংলগ্ন একটি সমতল এলাকায় পৌঁছান তিনি। সেখান থেকে নো ম্যানস ল্যান্ডের কাছের একটি গাছে দূরে থাকা মদনটাক দেখতে পান। অনেক দূর থেকে ক্যামেরায় পাখিটির ছবি তোলা সম্ভব হলেও কাছ থেকে দেখার সুযোগ না পাওয়ায় সেই অভিজ্ঞতা পুরোপুরি তৃপ্তি দেয়নি।
এরপর পঞ্চগড়েও মদনটাকের দেখা পাওয়ার খবর মিলেছে। তবে নিয়মিত দেখা না যাওয়ায় সেখানে পাখিটির খোঁজে যাওয়া সম্ভব হয়নি সবসময়। ২০২২ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের পাখির আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহী মদনটাকের একটি কলোনির সন্ধান দেওয়ার পর নতুন করে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন কয়েকজন পাখিপ্রেমী।
এক শীতের সকালে রংপুর থেকে তাঁরা ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত এলাকার উদ্দেশে রওনা হন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর একটি গাছের কাছে দেখা মেলে বহু মদনটাকের। সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পাখি দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই এলাকায় আরও মদনটাক রয়েছে, যেগুলো খাবারের সন্ধানে অন্যদিকে চলে গেছে।
পাখিপ্রেমীদের জন্য সেই অভিজ্ঞতা ছিল বিশেষ আনন্দের। সেদিন আকাশ মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় ভালো ছবি তোলার পরিবেশ ছিল না। এরপরও এতগুলো মদনটাক একসঙ্গে দেখার সুযোগ তাঁদের আনন্দ দিয়েছে। কয়েক মাস পর আবার একই এলাকায় গিয়ে রোদঝলমলে দিনে মদনটাকের ছবি তোলার সুযোগ হয়। আকাশে উড়ে বেড়ানো কয়েকটি পাখিকেও তখন দেখা যায়।
সুন্দরবনেও মদনটাকের উপস্থিতি রয়েছে। তবে সেখানে পাখিটি খুব বেশি সংখ্যায় দেখা যায় না। সুন্দরবনের খাল, নদী ও জলাভূমির আশপাশে মাঝেমধ্যে এই পাখির দেখা পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও সুন্দরবনে মদনটাকের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
মদনটাকের বৈজ্ঞানিক নাম Leptoptilos javanicus। ইংরেজিতে এটি লেসার অ্যাডজুট্যান্ট নামে পরিচিত। বড় আকৃতির এই পাখির লম্বা ঠোঁট এবং তুলনামূলক খালি মাথা তাকে অন্য অনেক পাখি থেকে আলাদা করে চেনায়। এর দেহের ওপরের অংশে নীলচে ও কালোর মিশ্র আভা দেখা যায়। গলা হলুদ, বুকের অংশ সাদা এবং পা লম্বা।
মদনটাক সাধারণত নদী, খাল, জলাভূমি, ঘাসযুক্ত এলাকা ও নরম কাদাযুক্ত জায়গায় খাবার খোঁজে। মাছ, ব্যাঙ, সরীসৃপ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এর খাদ্যের মধ্যে রয়েছে। উপযুক্ত আবাসস্থল ও খাবারের জোগান না থাকলে পাখিটির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে মদনটাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে আবাসস্থলের সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ড, খাদ্যের সংকট এবং পরিবেশগত পরিবর্তনও এই পাখির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্বল বা আহত মদনটাক উদ্ধারের ঘটনাও পাওয়া গেছে।
একসময় যে পাখি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা যেত, সেটি এখন নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তাই যেসব এলাকায় এখনো মদনটাকের উপস্থিতি রয়েছে, সেসব স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি। জলাভূমি, নদী ও খালপাড়ের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং পাখি শিকার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই দুর্লভ পাখিটির অস্তিত্ব ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মদনটাক শুধু একটি পাখির নাম নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যেরও একটি অংশ। প্রকৃতিতে এই পাখির উপস্থিতি টিকিয়ে রাখতে হলে তার নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস রক্ষা করতে হবে। তা না হলে একসময় বাংলাদেশের আকাশ ও জলাভূমি থেকে মদনটাকের দেখা পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন