কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ধরা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব কেন্দ্রের নানা সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চালুর পর কয়েক বছর না যেতেই বড় কয়েকটি কেন্দ্রে দেখা দিয়েছে যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন, কয়লা সরবরাহের জটিলতা এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ এখন কেন্দ্রগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত সময়সূচি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
দেশের বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি পায়রা। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের দুটি ইউনিটই সাম্প্রতিক সময়ে সমস্যার মুখে পড়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি ও মেরামতের প্রয়োজনের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে কেন্দ্রটি থেকে তুলনামূলক কম পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি ইউনিট ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে অন্য ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু যান্ত্রিক সমস্যা নয়, পায়রা কেন্দ্রের জন্য কয়লা পরিবহনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা কম থাকায় জাহাজে কয়লা আনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে চ্যানেল ড্রেজিং নিয়েও আলোচনা চলছে।
আরেকটি বড় কেন্দ্র রামপাল। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের উৎপাদন নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে কেন্দ্রটির কোনো না কোনো ইউনিট একাধিকবার বন্ধ হয়েছে। বিশেষ করে বয়লার টিউবসংক্রান্ত সমস্যা বারবার দেখা দেওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজন হচ্ছে। আগামী শীত মৌসুমে দুই ইউনিটের নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা সময়ে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রটিতে কয়লার সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে মোংলা বন্দরের সংশ্লিষ্ট চ্যানেলে নাব্যতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নতুন চালু হওয়া ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্রে এরই মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বয়লার টিউবের বড় একটি অংশ পরিবর্তন করার প্রয়োজন হওয়ায় কেন্দ্রটির ইউনিটগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ রাখার প্রস্তুতি চলছে। কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও সংরক্ষণ মেরামতের প্রয়োজনের কথা জানানো হয়েছে। এই কেন্দ্রের ব্যবহৃত কয়লার মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি পরিদর্শন করেছে। তাদের প্রতিবেদনের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
বরিশালের ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রেও পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রের ইয়ার্ডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লা মজুত থাকার পরও কোল মিলসংক্রান্ত সমস্যার কারণে উৎপাদন সীমিত রয়েছে। ফলে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। তবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বেসরকারি এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। এখন পর্যন্ত সেখানে বড় কোনো যান্ত্রিক সমস্যার তথ্য পাওয়া যায়নি এবং কেন্দ্রটি কয়লা আমদানির জন্য এলসিও করেছে। অর্থাৎ সব কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পরিস্থিতি এক নয়; কেন্দ্রভেদে সমস্যার ধরন ও মাত্রাও আলাদা।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিস্থিতিও দীর্ঘদিন ধরে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট কয়েক বছর ধরে বন্ধ। অন্যদিকে চালু থাকা প্রথম ও তৃতীয় ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমেছে। ৫২৫ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার কেন্দ্রটি বর্তমানে প্রায় ২০০ মেগাওইয়াট।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন