ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়, প্রতিদিন দুধ খেলে হাড় শক্ত থাকে। দুধে থাকা ক্যালশিয়াম হাড়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শুধু বেশি দুধ খেলেই হাড় ক্ষয়জনিত রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাড় সুস্থ রাখতে দুধ অবশ্যই উপকারী, তবে এটি একমাত্র সমাধান নয়। বরং সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন— সবকিছুর সমন্বয়েই দীর্ঘদিন হাড়কে মজবুত রাখা সম্ভব।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে হাড় ক্ষয়জনিত রোগ বা অস্টিওপোরোসিস বলা হয়। এ রোগে শরীর নতুন হাড় পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারে না অথবা পুরোনো হাড় দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। ফলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাতেও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিশ্বজুড়েই বয়স্কদের হাড় ভাঙার অন্যতম প্রধান কারণ এটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধে প্রচুর ক্যালশিয়াম থাকলেও এতে আরও রয়েছে ফসফরাস, প্রোটিন এবং অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি। এসব উপাদান শরীরে ক্যালশিয়াম শোষণে সহায়তা করে এবং হাড়ের গঠন শক্তিশালী রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে দুধ বা দুধজাত খাবার রাখা উপকারী।
তবে অনেকেই মনে করেন, যত বেশি দুধ পান করবেন, তত বেশি হাড় শক্ত হবে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ শরীর নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ক্যালশিয়াম ব্যবহার করতে পারে না। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালশিয়াম গ্রহণ করলেই বাড়তি উপকার পাওয়া যায় না।
এছাড়া শুধু দুধের ওপর নির্ভর করলে অনেক সময় অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। ফলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবারও রাখা জরুরি।
যাদের দুধ হজমে সমস্যা রয়েছে বা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দুধ খেলে পেট ফাঁপা, পেটব্যথা, গ্যাস কিংবা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে দুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
হাড় সুস্থ রাখতে শুধু খাবারই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, নাচ, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা ওজন বহনের ব্যায়াম হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু সময় রোদে থাকলে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা ক্যালশিয়াম শোষণে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেন, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান দীর্ঘমেয়াদে হাড়কে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই এসব অভ্যাস থেকে দূরে থাকা, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং সক্রিয় জীবনযাপন হাড় ভালো রাখার অন্যতম কার্যকর উপায়।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হাড় ক্ষয় রোধে কোনো একক খাবার বা পানীয়কে অলৌকিক সমাধান মনে করা উচিত নয়। দুধ অবশ্যই পুষ্টিকর একটি খাবার এবং হাড়ের জন্য উপকারী। তবে শুধুমাত্র বেশি দুধ খাওয়ার ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই দীর্ঘদিন হাড়কে সুস্থ ও মজবুত রাখতে সবচেয়ে কার্যকর।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন