নিরাপদ খাদ্য নিবন্ধন এখন থেকে সব ধরনের খাবারের ব্যবসার জন্য বাধ্যতামূলক হচ্ছে। রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, বেকারি ও আমদানিকারক—খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হবে।
সম্প্রতি ‘নিরাপদ খাদ্য (নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং) প্রবিধানমালা’ নামে নতুন বিধিমালা সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ এবং খাদ্য ব্যবসায় নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নতুন বিধিমালায় খাদ্য ব্যবসাকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে নিবন্ধন যথেষ্ট হলেও বিশেষ ধরনের বা ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যপণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে লাইসেন্স। এর আওতায় রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের জুসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে।
এ ছাড়া প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও নিবন্ধন নিতে হবে। এমনকি রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজুসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও নতুন নিয়মের আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। শিশুদের ফর্মুলা দুধ, নির্দিষ্ট রোগীদের জন্য তৈরি খাবার, ভিটামিন বা খনিজযুক্ত ফর্টিফায়েড খাবার, অর্গানিক পণ্য, জিএমও খাদ্য এবং বিকিরণ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নিতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য গুদাম, হিমাগার এবং ভোজ্যতেলের উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠানও লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় থাকবে। সাধারণভাবে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর, এরপর নবায়ন করতে হবে।
নিবন্ধনের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা থেকে। নবায়নের ক্ষেত্রে দিতে হবে ৫০০ টাকা। বড় প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ওপর নির্ভর করবে। ছোট দোকানের জন্য ফি ১ হাজার টাকা হলেও বড় গুদাম বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নতুন এই নিয়ম নিয়ে কিছু উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের দাবি, খাদ্য ব্যবসায়ীদের আগে থেকেই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। এর সঙ্গে নতুন নিবন্ধন যুক্ত হলে ব্যবসার খরচ ও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য ভালো হলেও নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অনেকগুলো সংস্থার আলাদা অনুমোদন ব্যবস্থার কারণে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতিও বলেছে, শুধু নতুন বিধিমালা দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুরুতে বড় শিল্প পর্যায়ের খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিএসটিআইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সনদ থাকলেও খাদ্যের মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বিএফএসএ।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, আমদানি করা খাদ্যপণ্যের মান যাচাই এবং ভেজাল প্রতিরোধে বিভিন্ন বন্দরে বিশেষ কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হবে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন